৬৫০০ কি.মি. রাস্তা ভাঙাচোরা আর নদী নালার মত গর্ত !

0
40

ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি এড়াতে ট্রেনের দিকে ঝুঁকছে যাত্রীরা

সারাদেশে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক ভাঙাচোরা। বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও কয়েক কিলোমিটার। এরই মধ্যে বন্যায় তলিয়ে গেছে দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রামসহ দেশের কয়েকটি স্থানের মহাসড়ক। তবে অনেকের মতে, বাস্তবে ভাঙাচোরা সড়কের দৈর্ঘ্য আরও অনেক বেশি। এমতবস্থায় ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি এড়াতে ঘরমুখি মানুষ ঝুঁকেছে ট্রেনের দিকে। মহাসড়কের বেহাল দশার কারণে এবার ঈদে দুরপাল্লা বাসের ট্রিপ কমিয়ে আনার চিন্তা-ভাবনা করছেন বাস মালিকরা। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার খানাখন্দ সংস্কারের দাবি জানিয়ে গতকাল শনিবার ধর্মঘটের আল্টিমেটাম দিয়েছে বরিশাল জেলা বাস সমিতি।

রাস্তা

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদুল আযহার সাত দিন আগে ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়ক মেরামতের নির্দেশনা জারি করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। ভাঙাচোরা সড়ক মেরামতে জন্য ৯ হাজার ১৫৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা প্রয়োজন। অথচ চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ১ হাজার ৭০৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থার যে তথ্য পাওয়া গেছে তা ভয়াবহ বলেই প্রতীয়মান হয়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়কের ৬৫ কিলোমিটারেরও বেশি খানাখন্দে ভরা। ফেনী-নোয়াখালী-লক্ষীপুর মহাসড়কের সিংহভাগ যান চলাচলের অযোগ্য। ঢাকা-গাজীপুর, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অনেক অংশ ভেঙ্গে গর্তে পরিণত হয়েছে। ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ থেকে শেরপুর পর্যন্ত ভাঙাচোরা। কয়েকদিন আগেও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সিরাজগঞ্জে এই মহাসড়কটি পরিদর্শন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে।

একই সাথে তিনি ১০ দিনের মধ্যে ওই মহাসড়ক মেরামতের নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে, বগুড়া-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কটি মাসখানেকের বেশি সময় ধরে চলাচলের অযোগ্য। যশোর বেনাপোল মহাসড়কের বেহাল অংশ মেরামত করা হলেও তা যেনোতেনোভাবে করার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়কটিও এক বছর যেতে না যেতেই ভাঙতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে চার লেনের এই মহাসড়কের কোনো কোনো অংশে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির তোড়ে ভেঙ্গে গেছে লেনের কিনারার অংশ। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) সর্বশেষ প্রতিবেদনে সড়ক-মহাসড়কের বেহাল চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, সওজের আওতাধীন সড়কের মধ্যে ৬ হাজার ২০৭ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। এর মধ্যে জেলা সড়কগুলোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ভালো অবস্থায় আছে ৬ হাজার ৫০৯ কিলোমিটার। বাকি অংশের মধ্যে ৩ হাজার ৯০৫ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক মোটামুটি চলনসই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ হাজার ৬৫৮ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ১ হাজার ৯৭৭ কিলোমিটার বা ৫৪ শতাংশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। মোটামুটি চলনসই অবস্থায় আছে ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়ক। বাকি ২০ দশমিক ৪৪ শতাংশ খানাখন্দ রয়েছে। সওজের ১০টি জোনের জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ঢাকা ও রংপুরের মহাসড়কের অবস্থা সবচেয়ে ভালো। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কুমিল্লা ও খুলনায়। এ ছাড়া রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও কুমিল্লা জোনের সড়কের বড় অংশই মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে।

অন্যদিকে, ৩ হাজার ৯৪১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ১ হাজার ৬৮৮ কিলোমিটার ভালো অবস্থায় রয়েছে। আর ২৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ মোটামুটি চলনসই ও ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশ ব্যবহার অনুপযোগী। আঞ্চলিক মহাসড়কের সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে রংপুর, গোপালগঞ্জ ও বরিশাল জোনে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা খুলনা ও রাজশাহী জোনের সড়কের। অন্যান্য জোনের সড়ক মোটামুটি চলনসই।
অপরদিকে, ৯ হাজার ২২ কিলোমিটার জেলা সড়কের ২ হাজার ৮৪৫ কিলোমিটার বা ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ ভালো অবস্থায় রয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মোটামুটি চলনসই জেলা সড়ক ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর ৪৭ শতাংশ সড়ক ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা ও কুমিল্লা জোনের জেলা সড়ক। এ তো গেল সরকারি হিসাব। বাস্তবে দেশের সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা এর চেয়ে অনেক বেশি খারাপ। বিশেষ করে চলতি বর্ষা ও বন্যায় দেশের অনেক জেলার সড়ক-মহাসড়ক ভেঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকার মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-দিনাজপুর, ঢাকা-কুড়িগ্রাম, ঢাকা-নওগাঁ মহাসড়ক ইতোমধ্যে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সড়ক বা মহাসড়ক একবার পানিতে তলিয়ে গেলে তা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানি নেমে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মহাসড়কের উপরের ঢালাই বা পিচ উঠে গিয়ে নিমিষেই খানাখন্দের সৃষ্টি হয়। তখন আর এটি যান চলাচলের উপযোগি থাকে না।

সওজের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদনে ভাঙাচোরা মহাসড়ক মেরামতের জন্য ৫ হাজার ৮১৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভাঙাচোরা জাতীয় মহাসড়কগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ২ হাজার কিলোমিটার মেরামত করতে হবে। এ ছাড়া ২৫৫ কিলোমিটার আংশিক ও ১৭৯ কিলোমিটার পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। একইভাবে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ২ হাজার ৪৯ কিলোমিটার মেরামত এবং ১৭৯ কিলোমিটার আংশিক ও ১৫২ কিলোমিটার পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করতে হবে। অন্যদিকে, জেলা সড়কের ২ হাজার ৭৬৮ কিলোমিটার মেরামত ও বাকিটা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এতে খরচ পড়বে ৩ হাজার ৩৩৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো ব্যবহার উপযোগি করতে ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগিদের মতে, বর্ষা এলেই দেশের সড়ক-মহাসড়ক মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও এর কোনো সুফল মেলে না। বরং এতে সওজের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হয়। মেরামতের নামে যা করা হয় তা অনেকটাই লোক দেখানো। জরুরী ভিত্তিতে করা ওই সব কাজের মান বজায় রাখা হয় না। জোড়াতালি দিয়ে করা সড়ক-মহাসড়ক কয়েকদিনের মধ্যেই আবার ভেঙ্গে খানাখন্দে রুপ নেয়। ঢাকা-রংপুর রুটের এক বাস মালিক বলেন, গত বছর ঈদে গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত মহাসড়কের খানাখন্দগুলো জরুরী ভিত্তিতে মেরামত করা হয়েছিল। কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেগুলো আবার আগের মতোই গর্তে ভরে গেছে। এবারও একই সড়ক মেরামত করতে হচ্ছে। অথচ মেরামত খাতে সওজের বরাদ্দ শত শত কোটি টাকা। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের এক বাস মালিক বলেন, বর্তমানে চলাচলরত দুরপাল্লার বাসের বেশিরভাগই নতুন বা বেশিরভাগেরই বয়স ২/৩ বছরের বেশি হবে না। কিন্তু শুধুমাত্র সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থার কারণে এগুলো এখনই পুরাতন হয়ে গেছে। টায়ার টিউব কিনতে কিনতে মালিকরা পথে বসার উপক্রম। যান্ত্রিক অন্যান্য ত্রæটিতো আছেই। তিনি বলেন, আমরা লাখ লাখ টাকা ট্যাক্স দিচ্ছি কিন্তু বিনিময়ে সেবা পাচ্ছি না।

সওজ সূত্র জানায়, গত অর্থবছর ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়ক মেরামতে ১০টি জোনে একশটি ছোট-বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। গত বছর জুনের মধ্যে মাত্র ২৮টি প্রকল্প শেষ হয়। বাকিগুলো এখনও শেষ হয়নি। এর মধ্যে হানা দিয়েছে অতি বৃষ্টি ও বন্যা। ইতোমধ্যে বৃষ্টি ও বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে সড়ক-মহাসড়কের। সে হিসাব সওজের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদনের সমীক্ষায় উঠে আসেনি। এ কারণেই উল্লেখিত সাড়ে ৬ হাজার ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়কের হিসাবের সাথে বাস্তবের গড়মিল রয়েছে। ট্রেনে ঝুঁকছেন যাত্রীরা..

ঈদ এলে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণের টানে ছুটে যান গ্রামের বাড়িতে। এবারও ছুটবেন। এবার দেশের সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা আঁচ করতে পেরে ঘরমুখি মানুষ ছুটছেন ট্রেনের দিকে। গত দুদিন কমলাপুরে ট্রেনের অগ্রিম টিকিটের জন্য হাজার হাজার মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। রেল কর্তৃপক্ষ ঈদে ঘরমুখি যাত্রীর চাপ সামলাতে ১৪টি অতিরিক্ত ট্রেন চালাবে। প্রতিটি ট্রেনে কোচ বা বগির সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। তারপরেও এবার যাত্রীদের চাহিদা নিয়ে চিন্তিত রেল কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে কমলাপুরে ট্রেনের টিকিটের জন্য মানুষের ঢল দেখে কর্মকর্তারা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। জানতে চাইলে একাধিক যাত্রী বলেছেন, মহাসড়কের বেহাল দশার কারণে গত ঈদে ৫ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ১৮ ঘণ্টা লেগেছে। এবার অবস্থা আরও খারাপ। সে কারণে তারা ট্রেনের দিকে ঝুঁকেছেন। কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার যাত্রীদের চাপ অনেক বেশি।

বাস মালিক সমিতির ধর্মঘটের আল্টিমেটাম:
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার সড়ক-মহাড়কের খানাখন্দ সংস্কারের দাবি জানিয়ে ধর্মঘটের আল্টিমেটাম দিয়েছে বরিশাল জেলা বাস মালিক সমিতি। গতকাল শনিবার দুপুরে বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ আল্টিমেটাম দেয়া হয়। লিখিত বক্তব্যে বরিশাল জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ আফতাব হোসেন জানান, ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের জয়শ্রী থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত রাস্তা খানাখন্দে ভরা। প্রায়ই এ সড়কে বাস-ট্রাক ফেঁসে (আটকাপড়ে) যায়। তখন সেগুলোকে রেকার দিয়ে ওঠাতে হয়। আর ছোট গাড়ি তো চলতেই পারছে না। তিনি বলেন, পবিত্র ঈদুল আযহা সন্নিকটে এসে গেছে। ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে মানুষ এই মহাসড়ক হয়ে বরিশালে আসবে, আবার বরিশাল থেকে ঢাকায় যাবে। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে সড়ক সংস্কারের প্রয়োজন। সংবাদ সম্মেলনে সড়ক সংস্কারের দাবিতে আজ রোববার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে মানববন্ধন কর্মসূচি, ২৪ আগস্ট বৃহষ্পতিবার বেলা ১১ টায় প্রতীকী সড়ক অবরোধ, ২৭ আগস্ট রোববার বরিশালের সড়ক ভবন ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়। এতেও সমাধান না হলে ঈদের সাত দিন পর অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থা ও এসব মেরামতের বিষয়ে কথা বলার জন্য গতকাল সড়ক ও জনপথের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসানের মোবাইলে ফোন করলে তিনি রিসিভ না করায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here