রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

0
5

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নৃশংসতার মুখে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের সপ্তদশ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “তারা বিপদে পড়ে এসেছে, তাদের আশ্রয় দিয়েছি। তাদের যেন কষ্ট না হয়।”

চোখের সামনে স্বজন খুনের দৃশ্য সঙ্গী করে আসা রোহিঙ্গাদের কথা বলতে গিয়ে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠ, নিজেদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেন তিনি।

“দরকার হলে আমাদের খাবার ভাগ করে খাব। আমরা তো মিয়ানমারের মতো নাফ নদীতে ফেলতে পারি না, বঙ্গোপসাগরেও ফেলতে পারি না। তারা যখন আমাদের দেশে আছে, মূল দায়িত্ব আমাদের,” বলেন তিনি।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে গত ২৫ সেপ্টম্বর থেকে বাংলাদেশ অভিমুখে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। কয়েক দশক ধরে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশে এই কয়দিনে আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী ঢুকেছে।

শরণার্থীদের পরিস্থিতি দেখতে গত মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে যান শেখ হাসিনা। সেখানে সর্বস্ব হারিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শিশু ও নারীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটি শিশুর সাথে কথা বললাম, চোখে পানি চলে আসে। একটা বাচ্চা- তার চোখের সামনে তার বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে, তিন বোনকে মেরে ফেলেছে। সে তার দাদা-দাদির সঙ্গে কোনো মতে পালিয়ে এসেছে। সে নিজেও আহত।

“দুটি মেয়ে, তাদের বাবা-মা কেউ নেই। দুই বোন চলে এসেছে। এই দুই বোনের এখন আপন বলে আর কেউ নেই। আর একটি মেয়ে তার ছোট্ট ভাইটিকে নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আসছিল। ভাইটি যে কোথায় হারিয়ে গেছে সে বলতে পারে না।”

“এই করুণ কাহিনীর কথা শুনতে হচ্ছে। এটা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না,” বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের ওপর এই অমানবিকতা বন্ধ এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে ফেরত নিতে হবে।”
মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকারের বিষয়ে তিনি বলেন, “এরা তো ওখান (মিয়ানমার) থেকেই এসেছে। তাদের ভাষাও দুর্বোধ্য।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মিয়ানমার সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর যেভাবে অত্যাচার নির্যাতন করে যাচ্ছে… আমাদের কথা হলো যারা দোষী তাদের ওপর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার কেন?

“মিয়ানমারে এখনও দূর থেকে দেখা যায় আগুন জ্বলছে। এখনও মানুষ আসছে।

শেখ হাসিনা বলেন, “আশা করি, মিয়ানমারের চেতনার উদয় হবে। তারা তাদের নাগরিকদের ফেরত নিয়ে নিরাপদে যাতে বসবাস করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”

মানবিক কারণে মিয়ানমারের এই নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “বিরাট একটা বোঝা ঠিকই, কিন্তু মানবতার কারণেই আমরা আশ্রয় দিয়েছি। আমাদের বিবেকে লেগেছে। এই অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনা শুনলে ও দেখলে কোনো মানুষ সহ্য করতে পারে না।”

লাখ লাখ মানুষের আশ্রয় নিশ্চিত করতে সমস্যার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “এদেরকে কীভাবে, কোথায় রাখব- সেটা একটা বিরাট সমস্যা।

“লাখ লাখ মানুষ আসছে। ইতোমধ্যে তিন লাখের ওপর মানুষ প্রবেশ করেছে। এখনও মানুষ আসছে।”

যারা মিয়ানমারের সেনা ক্যাম্প ও পুলিশের চৌকিতে হামলা করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করেছে, তাদের গ্রেপ্তারের কথাও বলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশের ভূমি অন্য কোনো দেশে সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করতে না দেওয়ার নীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট। আমরা এ ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী কাউকে প্রশ্রয় দেব না।”

পালিয়ে ছুটতে ছুটতে বাংলাদেশে ঢুকেছেন এই রোহিঙ্গারা। এখন তাদের এই ছোটা টেকনাফের হাড়িয়াখালী থেকে শরণার্থী শিবিরের উদ্দেশে। রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় সারা বিশ্ব জেগে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।
“সব দেশ থেকে মিয়ানমারকে বলা হচ্ছে, তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এবং এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করার জন্য।”

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো মিয়ানমারের নেত্রী অন সাং সু চির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে এই সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মিয়ানমারকে নির্যাতন বন্ধ ও তাদের নাগরিকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে বলেছেন। ঢাকাস্থ বিদেশি মিশনের প্রতিনিধিরা গত বুধবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। সেখানেও মিয়ানমার যে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এখন ভারত, তুরস্ক, মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ পাঠিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ না দিয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে তা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তাদের (রোহিঙ্গা) কোনো রকম কষ্ট না হয়, তারা যেন সব ধরনের সহযোগিতা পায়, সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি।

“তাদের নিবন্ধন করা হচ্ছে। তাদের নাম ঠিকানা ও ছবিসহ বিশেষ আইডি কার্ড করে দেওয়া হবে। তার রঙটাও আলাদা হবে।”

শরণার্থীদের জন্য কক্সবাজারের দুই হাজার একর জায়গা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আপাতত সেখানে রাখা হচ্ছে। কিছু টিনসেড করে দেওয়া হয়েছে। তবে এভাবে তারা বেশি দিন থাকলে নানা সমস্যা দেখা দেবে।”

নোয়াখালীর হাতিয়ার ঠেংগার চরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের জন্য নৌবাহিনী প্রধানের সঙ্গে কথা বলবেন বলে সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী।

উখিয়ার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, “এদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে আমাদের যত কষ্টই হোক না কেন আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি।”

সবাইকে রোহিঙ্গাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের সাধ্যমত সব রকম ব্যবস্থা নিচ্ছি। দেশবাসীকে বলব, এরা বিপদে পড়ে আমাদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের যেন কষ্ট না হয়। স্থানীয় জনগণ, রাজনৈতিক দল তারা সকলে যেন তাদের দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়।

“তবে এই জনস্রোতের সঙ্গে ঘটনার জন্য যারা দোষী, যারা এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে; তারা যেন না কোনোভাবে ঢুকতে না পারে, আশ্রয় না পায়।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here