রেল কর্মচারীরা বেপরোয়া টিকিট কালোবাজারিতে

0
16

রাজশাহী-ঢাকা রুটের তিনটি ট্রেনের প্রায় তিন হাজার টিকিটের অর্ধেকই কালোবাজারিদের হাতে চলে যাচ্ছে

 

রেল কর্মচারীরা বেপরোয়া টিকিট কালোবাজারিতে

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা। রাজশাহী স্টেশনের ৪ নম্বর কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন জনাদশেক টিকিটপ্রত্যাশী। তাঁদের উদ্দেশ্য রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করা। কিন্তু দু-একজন ছাড়া বাকি সবাই কাউন্টারের কাছে গিয়ে বুকিং সহকারীর সঙ্গে কথা বলেই আবার ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। তবে লাইন ছাড়া বাম দিক দিয়ে কাউন্টারের সামনে গিয়ে ঠিকই একই ব্যক্তি কয়েকটি টিকিট কাউন্টার থেকে নিয়ে চলে এলেন। টিকিট নেওয়ার আগে ওই ব্যক্তিকে আরেকজনকে কাউন্টারের সামনেই টাকা গুনে নিতে দেখা যায়।

এই দৃশ্যের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ব্যক্তি হলো সেই ব্যক্তি যিনি রাজশাহী নগরীর দরিখরবোনা রেলগেটের গেটকিপার। তাঁর নাম মোহাম্মদ বাচ্চু। অভিযোগ উঠেছে, এই বাচ্চু এখন আর গেটকিপার হিসেবে কাজ করেন না। তাঁর হয়ে কাজ করে দেয় অন্য একজন। আর বাচ্চু স্টেশনে গিয়ে একাধারে টিকিট নিজের বগলদাবা করে বিক্রি করেন কালোবাজারে।

বুকিং সহকারীদের ম্যানেজ করে বাচ্চু এই কাজটি করে যাচ্ছেন বেশ কিছুদিন ধরে, হোসেনের কাছ থেকে কয়েকটি টিকিট বুঝে নিচ্ছেন। আবার একটু পরে সেই টিকিট বাচ্চু অন্য আরেক ব্যক্তির হাতে তুলে দিচ্ছেন। বুকিং সহকারী সিয়ামকে কাউন্টার থেকে বাইরে এসে স্টেশনের ভেতরের ছাউনির মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে বাচ্চুর হাতে টিকিটগুলো তুলে দিতে দেখা যায়। কাউন্টার থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় টিকিটগুলো বাচ্চুর হাতে তুলে দিয়ে যান সিয়াম। বিনিময়ে টিকিটপ্রতি সিয়াম এক-দেড় শ টাকা বেশি আদায় করেন বাচ্চুর কাছ থেকে। তবে টিকিট কালোবাজারি সম্পর্কে জানার জন্য সিয়ামের সঙ্গে পরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এভাবেই প্রতিদিন রাজশাহী স্টেশন থেকে শত শত টিকিট চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। আর যেসব বেপরোয়া কালোবাজারি এ কাজে জড়িত, তাদের অধিকাংশই রেলওয়েরই কর্মকর্তা-কর্মচারী। যাদের কেউ কেউ রয়েছেন রেলওয়ে শ্রমিক লীগের বিভিন্ন পদেও।

তবে রেলের টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন গেটকিপার বাচ্চু। তবে কেন এত টিকিট প্রয়োজন হলো—তার কোনো সদুত্তর তিনি না দিয়েই চলে যান।

এদিকে ৪ নম্বর কাউন্টার থেকে টিকিট নেওয়ার আগে রেলওয়ের আরেক কর্মচারী নূর সালামকেও কয়েকটি টিকিট নিয়ে চলে যেতে দেখা যায়। এই নূর সালামকে এর আগেও একবার টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে র‌্যাব হাতেনাতে আটক করেছিল। এনলাইটিং কর্মচারী নূর সালাম তার পরও টিকিট কালোবাজারি ছাড়তে পারেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজশাহী রেলওয়ের কয়েকজন বুকিং সহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে মূলত জড়িত রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই। তারাই এসে প্রতিদিন শত শত টিকিট নিয়ে চলে যায়। তবে কর্মকর্তাদের ছাড়া অন্যদের কাছ থেকে বুকিং সহকারীরাও একটি অংশ ভাগ নেয়। বিশেষ করে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের এসি বাথ, এসি চেয়ার ও এসি কেবিনের টিকিট কালোবাজারি হচ্ছে ব্যাপক হারে। এর বাইরে সাধারণ চেয়ারের টিকিটও চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। কালোবাজারিদের এই তালিকায় স্থানীয় কয়েকজন যুবলীগ, আওয়ামী লীগ, যুবদল এবং বিএনপির নেতাকর্মীরাও জড়িত বলে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তবে সবচেয়ে বেশি টিকিট হাতিয়ে নিচ্ছে রেলওয়ের কর্মচারীরা এবং শ্রমিক লীগের এক নেতা। রেলওয়ে শ্রমিক লীগের একটি শাখার এক নেতা শুধু টিকিট কালোবাজারে বিক্রি করেই তিনি এখন লাখোপতি বনে গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একসময় ছাত্রদল করলেও ওই নেতা এখন শ্রমিক লীগের হর্তাকর্তা।

রাজশাহী স্টেশনের একাধিক সূত্র আরো নিশ্চিত করেছে, রাজশাহী-ঢাকা রুটে প্রতিদিন তিনটি ট্রেন চলাচল করে। এই তিনটি ট্রেনের প্রায় তিন হাজার টিকিটের মধ্যে অন্তত দেড় হাজার টিকিটই চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। বাকি দেড় হাজারের মধ্যে প্রায় এক হাজার যাচ্ছে সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতাদের বিভিন্ন কোটায়। আর প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০০ টিকিট পাচ্ছে সাধারণ যাত্রীরা। তিনটি ট্রেনের টিকিটই অন্তত পাঁচ দিন আগ থেকেই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে।

ফলে সাধারণ যাত্রীরা টিকিট কাটতে কাউন্টারে গেলেই কাউন্টার থেকে বলা হচ্ছে টিকি নেই। কিন্তু ঠিকই স্টেশনে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে টিকিট।

এ নিয়ে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে টিকিটপ্রত্যাশী কয়েকজন যাত্রীকেও। তাদের মধ্যে আলী আকবর নামের এক যাত্রী বলেন, ‘রাস্তাঘাটের যে অবস্থা তাতে ট্রেনই হলো মানুষের অন্যতম ভরসা। কিন্তু স্টেশনে এলেই বলে টিকি নেই। তাহলে টিকিটগুলো যায় কোথায়? সোমবারের জন্য একটি টিকিট নিতে এসে শুনতে হলো এসি চেয়ার নেই। সাধারণ টিকিটও নেই। তিন দিন আগেই এই টিকিট গেল কোথায়, কারা কিনল, কাউকে তো লাইনে দাঁড়িয়ে কিনতেও দেখছি না?’

টিকিট কালোবাজারির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী স্টেশনের স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট জিয়াউল হক বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমার কাছে নেই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। বুকিং সহকারীদের কেউ এ ধরনের কাজে জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

প্রসঙ্গত, গত ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী স্টেশনের ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি নিয়ে কালের কণ্ঠে একটি অনুসন্ধানী খবর প্রকাশিত হয়। এর আগে বছর তিনেক আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এক দিনেই ১১ জন কালোবাজারিকে আটক করে সাজা দেওয়া হয়েছিল। র‌্যাবের ওই অভিযানের পর আরো কয়েকবার বেশ কয়েকজনকে টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়। তবে বছয় দুয়েক হলো রাজশাহী স্টেশনে আর কোনো অভিযান না হওয়ায় এখন বেপরোয় টিকিট কালোবাজারিরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here