রাখাইনে ২৮৮ রোহিঙ্গা গ্রাম পোড়ানোর প্রমাণ পেয়েছে এইচআরডব্লিউ

0
18

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর দমন অভিযান শুরুর পর এক মাসেই ২৮৮টি রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। এছাড়া হামলার জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ী করে যে অভিযোগ উঠেছে, তারও কোনো সত্যতা খুঁজে পায়নি সংস্থাটি।

রাখাইনে ২৮৮ রোহিঙ্গা গ্রাম পোড়ানোর প্রমাণ পেয়েছে এইচআরডব্লিউ

স্যাটেলাইটে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে মঙ্গলবার সংস্থাটি জানিয়েছে, গত ২৫ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ২৮৮টি গ্রামের হাজার হাজার বাড়ি আংশিক বা পুরোপুরি ভষ্মীভূত হয়েছে।

এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে দুটি বিষয় তাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে।

প্রথমত, সেনা অভিযানের মধ্যে এই জ্বালাও-পোড়াওয়ের মূল লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গাদের গ্রাম। স্যাটেলাইট ছবিতে এমন অনেক জায়গা দেখা গেছে, যেখানে রোহিঙ্গা গ্রামের ধ্বংসাবশেষের পাশেই রাখাইনের বৌদ্ধদের গ্রাম রয়েছে অক্ষত।

দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার সরকার সেনা অভিযান বন্ধ হয়েছে বলে দাবি করলেও তারপরও নতুন নতুন গ্রাম জ্বলতে দেখা গেছে স্যাটেলাইট ছবিতে।

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত ১৮ আগস্ট প্রথমবারের মত রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে ভাষণ দিতে এসে দাবি করেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পর রাখাইনে আর কোনো দমন অভিযান চালানো হয়নি। কিন্তু এইচআরডব্লিউ বলছে, ৫ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্তত ৬৬টি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার প্রমাণ তাদের হাতে থাকা স্যাটেলাইট ছবিতে রয়েছে।

এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া বিভাগের উপ পরিচালক ফিল রবার্টসন বিবৃতিতে বলেন, রাখাইনের সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কেন পালিয়ে বাংলাদেশে গেছে, ওই স্যাটেলাইট ছবিতেই তা স্পষ্ট।

তিনি বলেন, ‘বার্মিজ মিলিটারি শয়ে শয়ে রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে; হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা পালাতে বাধ্য হয়েছে।’

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইনের মংডু, রাথেডং ও বুচিডং এলাকার স্যাটেলাইট ছবি থেকে ৮৬৬টি গ্রামের তথ্য তারা বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মংডু এলাকা। ওই এলাকার ৬২ শতাংশ গ্রাম আংশিক বা পুরোপুরি ভষ্মীভূত হয়েছে অভিযানের এক মাসের মধ্যে। মংডুর দক্ষিণাঞ্চলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৯০ শতাংশ গ্রাম।

কোনো কোনো স্যাটেলাইট ছবিতে বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে আগুন জ্বলার চিহ্ন পাওয়া গেছে। কোনো কোনো এলাকা জ্বলতে দেখা গেছে বেশ কয়েক দিন ধরে।

এইচআরডব্লিউ বলছে, মিয়ানমার সরকার গ্রামে গ্রামে এই নাশকতার জন্য বিদ্রোহীদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও স্থানীয় রোহিঙ্গাদের দায়ী করে এলেও ওই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ কখনও দেখায়নি। পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শতাধিক রোহিঙ্গার সাক্ষাতকার নেওয়ার কথা জানিয়ে মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের পেছনে রোহিঙ্গাদের দায়ী করেননি ওই সাক্ষাৎকারদাতাদের কেউ।

এইচআরডব্লিউর বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটানো হয়েছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত মিয়ানমার সরকার করেনি, কাউকে বিচারের মুখোমুখিও করা হয়নি। এই অবস্থায় জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনকে রাখাইনে তদন্ত করার সুযোগ দেয়। সেই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর অবিলম্বে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে। রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পেছনে মিয়ানমারের যে সেনা কর্মকর্তারা রয়েছে, তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের পদক্ষেপ নিতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে সব ধরনের সামরিক সহযোগিতাও বন্ধ করতে হবে জাতিসংঘের সদস্য সব রাষ্ট্রকে।’

ফিল রবার্টসন বলেন, ‘বার্মায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে লাখ লাখ মানুষের দুর্দশা একই মুদ্রার দুই পিঠ। রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে, সেই সঙ্গে সবার কাছে যেন জরুরি সহায়তা পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে হবে।’

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে কথিত হামলার পর থেকে নতুন করে সেনাবাহিনীর দমন অভিযান শুরু হয়। জাতিসংঘ এই দমন অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই দমন অভিযান থেকে বাঁচতে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে গত দুই দিনেই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এছাড়া, অন্তত ১৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তে আটকে রয়েছে বলে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here