যে কারণে সাকিব আল হাসানের মাথায় হাত বুলিয়ে আদরও করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

0
27

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্রিকেটপ্রেম নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ দলের খেলা দেখতে প্রায়ই তিনি চলে আসেন মাঠে। গতকালও নাতিকে নিয়ে মাঠে এসে জয় উদ্যাপন করলেন। অস্ট্রেলিয়াকে ধসিয়ে দেওয়ার নায়ক সাকিব আল হাসানের মাথায় হাত বুলিয়ে আদরও করে দিলেন।

যে কারণে সাকিব আল হাসানের মাথায় হাত বুলিয়ে আদরও করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

ঈদ করতে নড়াইলের পথে মাশরাফি বিন মর্তুজার সে কী তেজ, ‘মনের সাধ মিটে গেছে। এরপর চিটাগাং টেস্ট আর দেখব না, দেখিয়ে দিলাম তো!’ অস্ট্রেলিয়ার শেষ ব্যাটসম্যান জন হ্যাজেলউডকে তাইজুল ইসলাম এলবিডাব্লিউর ফাঁদে ফেলার পর স্টাম্প নিয়ে কাড়াকাড়ি, হুড়োহুড়ি থেকে শুরু করে ড্রেসিংরুমে সমস্বরে ‘আমরা করব জয়’ গানের আবহেও মুশফিকুর রহিমদের অভিন্ন স্টেটমেন্ট, ‘দেখিয়ে দিলাম তো!’ গত বছর এই শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় কিংবা নিজেদের শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর আনন্দেও নেচেছিলেন তাঁরা। তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের আড়ালে চাপা উল্লাস ঠিকরে বেরোচ্ছে তামিম থেকে শুরু করে মেহেদী হাসান মিরাজের শরীরী ভাষায়—বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার।

না, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পুরনো কোনো বিদ্বেষ নেই। বরং দলটির ক্রিকেট প্যাশনের ভক্ত বাংলাদেশ দলের সবাই। এমন মন লাগিয়ে ক্রিকেট খেলে আর কটা দেশ, টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি অজিদের টানটা আরো নিখাদ। প্রতিপক্ষ হিসেবেও ভয়ংকর। মাঠে সামান্যতম ছাড় দেয় না। ক্রিকেট প্ল্যানিং থেকে শুরু করে টেকনোলজি—কোথাও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই অস্ট্রেলিয়ার। এ কারণেই র্যাংকিংয়ের উত্থান-পতনেও ক্রিকেট শ্রেষ্ঠত্বের অঘোষিত মুকুটটা অস্ট্রেলিয়ারই। সেই দলের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের মহিমা তাই অনেক বেশি মাশরাফির কাছে, ‘এরপর কী হবে জানেন, কেউ আর আমাদের খাটো করে দেখবে না।

সবাই বলবে, ওরা অস্ট্রেলিয়াকেও হারিয়েছে। ’

সেই জয়ও ‘অস্ট্রেলিয়ান ওয়ে’তে। মাঠে ব্যাটে-বলে নির্দয় শাসনের সঙ্গে ‘কথা’র তুবড়িও ছুটবে সমানে। ওরা বলে যাবে আর আমরা শুনে যাব, সেই দিন শেষের ঘোষণা প্রকাশ্যেই দিয়েছেন মুশফিকুর রহিম আর ম্যাচের অবিসংবাদিত নায়ক সাকিব আল হাসান। বরং কখনো কখনো উদ্যোগী হয়েও নাকি স্লেজিং হয়েছে বাংলাদেশের তরফে। বাংলাদেশের উইকেট কঠিন হবে, প্রতিপক্ষও আগের মতো দুর্বল নয়—এটুকু জেনেই এসেছিলেন স্টিভেন স্মিথ। কিন্তু মাঠে অস্ট্রেলিয়ার মাস্তানিরও এমন পাল্টা আসবে, বিলক্ষণ ভাবেননি তিনি। সেই কারণেই কিনা ম্যাচের পর বাংলাদেশের সামগ্রিক শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক। অলক্ষ্যে যেন বাংলাদেশের ক্রিকেট পতাকাই বিশ্ব দরবারে উড়িয়ে দিলেন স্মিথ।

বড় একটা লাল-সবুজ পতাকা অবশ্য উড়েছে কাল মিরপুরে। প্রেসিডেন্ট বক্সে সেটি উড়িয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ দেখে স্মিথরা বিস্মিত নন সম্ভবত। কারণ প্রধানমন্ত্রীকুলে ক্রিকেটভক্তির প্রথম নিদর্শনও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড। বাংলাদেশের খেলা হলে টিভিতে চোখ থাকে প্রধানমন্ত্রীর, বড় জয়ের মঞ্চে উপস্থিতও হন তিনি। কাল এসেছিলেন, ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে ক্রিকেটারদের অভিনন্দন জানিয়ে বোর্ড সভাপতির রুমে ডেকে নিয়ে গেছেন তিন সিনিয়রকে—মুশফিকুর রহিম, সাকিব ও তামিমকে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের রূপকারও এই ‘ত্রিমূর্তি’।

বোর্ড সভাপতির রুমে দারুণ একটি ফ্রেম সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর হাতটা কি সাকিবের কান পাকড়ে আছে? অপত্য ভালোবাসায় কেমন কাঁচুমাচু হয়ে হাসছেন বিশ্বসেরা টেস্ট অলরাউন্ডার। ৫০তম টেস্ট রংধনুর সব রঙেই যে রাঙিয়েছেন সাকিব। প্রথম ইনিংসে তামিমের সঙ্গে লম্বা জুটিতে তাঁর অবদান ৮৪ রান, সঙ্গে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১০ উইকেট। এ নিয়ে ক্যারিয়ারে ইনিংসে পাঁচ কিংবা তার বেশি উইকেট হলো ১৭ বার, ম্যাচে ১০ উইকেট দুবার। ব্যাটে-বলের পাশাপাশি ম্যাচে সাকিবের ভূমিকাও চোখে পড়ার মতো। সহ-অধিনায়কও নন, তবু প্রো-অ্যাকটিভ হয়ে ফিল্ডিং সাজিয়েছেন, বোলারকে পরামর্শ দিয়েছেন, শাসিয়েছেনও। কাল যেমন একবার রাগে বল ছুড়ে মেরেছিলেন মেহেদী মিরাজকে। রাগের কারণ, অস্ট্রেলিয়ার শেষ ব্যাটসম্যানকে সামনে পেয়েও যে লেগস্টাম্পে ফুলটস দিয়েছিলেন মিরাজ! ম্যাচে সাকিবের এ আত্মনিবেদনকে রান-উইকেটের সমান গুরুত্ব দেন মাশরাফি, ‘সাকিব ইনভলভড থাকলে ম্যাচ জেতা সহজ হয়ে যায়। ’ সকালের প্রথম ঘণ্টায় ফতুল্লার দুঃসহ স্মৃতি ফিরিয়ে আনা স্মিথ-ওয়ার্নারকে ফিরিয়েছেন সাকিব। মিডল অর্ডারে ঝামেলা পাকাতে পারতেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল আর ম্যাথু ওয়েডও। এক প্রান্ত থেকে টানা বোলিংয়ে এ দুটি ‘কাঁটা’ও তুলেছেন সাকিবই। অগত্যা ম্যাচ সেরার পুরস্কারটা যে তাঁর হাতেই উঠবে, এ জানতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় থাকেননি কেউ।

শাহরুখ খানের দাপটে নায়িকাও কেমন পার্শ্বচরিত্র হয়ে যান! বলিউডের এ সর্বজনীন দুঃখের স্রোত কি তামিম ইকবালের মনেও বয়? তিনি অতশত পাত্তা দেন না অবশ্য, ‘টেনশনে হাত-পা কাঁপছিল। ভয় হচ্ছিল ক্যাচ এলে না আবার ফেলেটেলে দিই!’ কৌতুক করেই বলছিলেন। তবে তামিমের মন আর শরীর ক্লান্তিতে নুয়ে পড়াই স্বাভাবিক। মিরপুরের নড়বড়ে উইকেটে প্রতিটা বলই ব্যাটসম্যানের দক্ষতা আর মানসিকতার চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়েছে। আসলে নিচ্ছে বলা ভালো। সবশেষ ইংল্যান্ড সিরিজের ঢাকা টেস্টেও ব্যাটসম্যানকে প্রতিনিয়ত ‘আনকমন’ প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিয়েছে। সেই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি আর পরেরটিতে ৪০ রানের মহাগুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেললে মাতামাতি হয়েছিল মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে। কলম্বোয় দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অবশ্য মিলেছিল তামিমের। তবে ঢাকায় আবার তিনি আড়ালে সাকিবের দ্যুতিতে। অবশ্য নিজের ৫০তম টেস্টে জয়ের আনন্দের সঙ্গে দারুণ একটি স্বীকৃতিও মিলেছে তামিমের। মাশরাফি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘তামিম তুই অসাধারণ। সম্ভবত এই মূহূর্তে বিশ্বের সেরা ওপেনার। ’ এ নিয়ে যদি বা বিতর্কের অবকাশ থাকে, এ মূহূর্তে বাঁহাতি এই ওপেনারের ওপরই যে বাংলাদেশ ইনিংসের দৈর্ঘ্য নির্ভর করে, সেটি তর্কাতীত। সদ্য সমাপ্ত ঢাকা টেস্টে তাঁর ৭১ আর ৭৮ রানের ইনিংস দুটি দেখার পর সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের রায়, ‘টেকনিক্যালি তামিমের ইনিংস দুটি দুদল মিলিয়েই সেরা। ’ যদিও ম্যাচের একমাত্র সেঞ্চুরিটি ডেভিড ওয়ার্নারের। বেচারা, উপমহাদেশে রানখরা কাটিয়েও পড়ে রইলেন বিজিত দলে!

দুর্ভাগ্যের ম্যাচ খতিয়ানে তো একটা নামই লেখা—মুশফিকুর রহিম। সঙ্গীর জোরালো ড্রাইভে নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে দাঁড়িয়ে রান আউট হয়েছেন যে তিনি! ৪১ রানের ইনিংসটা ওভাবে কাটা না পড়লে বড় ইনিংসের সম্ভাবনাই ফুটে উঠেছিল বাংলাদেশ অধিনায়কের ব্যাটে। সেই আক্ষেপ মুশফিকের মিটে গিয়ে থাকবে কাল স্মিথের ক্যাচটি নিতে পেরে। আর সর্বোচ্চ পুরস্কার তো মিলেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ে। এ নিয়ে বাংলাদেশ সপ্তম জয় পেল মুশফিকের অধীনে।

ঢাকা টেস্টের ফ্ল্যাশব্যাকে এখানে সামান্য থামতেই হচ্ছে। ম্যাচের চার ইনিংস মিলিয়ে এই ত্রয়ীর পাশে স্থান দেওয়ার মতো আর কেউই যে নেই! ওহ হ্যাঁ, প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট আছে মেহেদী মিরাজের, দ্বিতীয় ইনিংসে সমান সাফল্য তাইজুল ইসলামের। স্লিপে দাঁড়িয়ে কাল দুটি ভালো ক্যাচ নিয়েছেন সৌম্য সরকার। তবে সেই অর্থে প্রভাবশালী ভূমিকা নেই তাঁদের কারোরই।

জয়ের আনন্দধারায়ও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে এই সমস্যাগুলো। প্রতি ম্যাচেই সাকিব-তামিম ব্যাটে-বলে খেলে দেবেন, ক্রিকেট এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। চট্টগ্রামে ২-০ নিশ্চিত করার অভিযানেও তাই দুশ্চিন্তা থাকছে। এ দুশ্চিন্তার কারণেই ঢাকা টেস্টের দল ঘোষণা থেকে একাদশ নির্বাচন নিয়ে বিস্তর আশঙ্কা ছিল। সাকিব-তামিম সেই আশঙ্কা আড়াল পেলেও সমস্যা কিন্তু রয়েই গেছে।

অবস্থাদৃষ্টে চট্টগ্রাম টেস্টের এজেন্ডা তৈরি হয়ে গেছে বাংলাদেশ দলের জন্য। ২-০-এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছাপিয়ে সেটি দলের বাকিরা শুনতেও পাচ্ছেন বলেই খবর। সেটা হলো, একাদশে থাকলেই হবে না, পারফর্মও করতে হবে। সে তুমি জুনিয়র বলে দায় এড়াতে পারো না! ঢাকা টেস্টের মঞ্চে তো বিশ্বকে ‘দেখিয়ে দিয়েছে’ বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে কি জুনিয়ররা পারবেন একাদশে থাকার যোগ্যতা প্রমাণ করতে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here