মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যান্সার : শনাক্ত ও প্রতিরোধের উপায়

0
30

প্রতি বছর এ রোগের প্রকোপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফুসফুসের ক্যান্সারের পরেই ব্রেস্ট ক্যান্সার এখন মহিলাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী অক্টোবর মাসকে ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়।

মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত ও প্রতিরোধের উপায়

ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার পাশ্চাত্য (৩৫-৫৫) অতি সাধারণ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। প্রতি বছর এ রোগের প্রকোপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফুসফুসের ক্যান্সারের পরেই ব্রেস্ট ক্যান্সার এখন মহিলাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী অক্টোবর মাসকে ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। বিশেষভাবে শিল্পসমৃদ্ধ পাশ্চাত্য দেশগুলোতেই ব্রেস্ট ক্যান্সার বেশি দেখা যায়। এ জন্য ব্রেস্ট ক্যান্সারকে Disease of Civiliation বলা হয়ে থাকে।

ব্রেস্ট ক্যান্সারের লক্ষণ : স্তনে চাকা বা পিণ্ড থাকা (ব্যথাবিহীন ৬৬ শতাংশ)। স্তনের আকারে পরিবর্তন হওয়া। স্তনের বোঁটা ভেতরে ঢুুকে যাওয়া। স্তনের বোঁটা থেকে অস্বাভাবিক রস ক্ষরণ। স্তনের চামড়ার রঙ পরিবর্তন। বগলতলায় চাকা বা পিণ্ড থাকা।

ব্রেস্ট ক্যান্সার যাদের বেশি হয় : ব্রেস্ট ক্যান্সারের নিশ্চিত কারণ অজানা। তবে জেনেটিক কারণ অন্যতম। যে সব পরিবারের নিকটাত্মীয়ের অন্তত দু’জন ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগীর ইতিহাস থাকে, তাদের চার থেকে ছয়গুণ বেশি সম্ভাবনা থাকে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার। এ ছাড়া যাদের অল্প বয়সে (১২ বছরের নিচে) মাসিক শুরুর ইতিহাস, অধিক বয়সে (৫০ বছর পর) রজনিবৃত্তি (Menopause), অধিক বয়সে প্রথম গর্ভধারণ (৩০ বছরের পর), যারা নিঃসন্তান, অধিক সময় গর্ভনিরোধক বড়ি সেবন, হরমোন থেরাপি গ্রহণ, স্থূলতা (Obesity), অ্যালকোহল সেবন ইত্যাদি কারণে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁঁকি বেড়ে থাকে। এ ছাড়া অধিক চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, বসা কাজের অভ্যাস, ব্যায়াম না করা, ক্রমাগত মানসিক চাপও ব্রেস্ট ক্যান্সারের জন্য দায়ী বলে বর্তমানে চিহ্নিত। অন্য দিকে যে সব মহিলার জরায়ু কিংবা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে, তাদের ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁঁকি থাকে। আবার ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগীর ফুসফুস, বোন, লিভার ক্যান্সার প্রবণতা থাকে।

ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ : মেয়েদের মাসিক শেষ হওয়ার পর পরই একটি নির্দিষ্ট দিনে নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করতে হবে। ব্রেস্টে কোনো ধরনের চাকা বা কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা থাকলে সাথে সাথেই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তবে ব্রেস্টে চাকা থাকা মানেই কিন্তু ক্যান্সার নয়।
শতকরা ১০ ভাগ চাকা হয়তো ভবিষ্যতে ক্যান্সার হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। অন্তত ২০ বছর বয়স থেকে সব মেয়েকেই নিজ স্তন নিজেই পরীক্ষায় অভ্যস্ত হওয়া দরকার। (নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষার কৌশল নিকটস্থ কোনো স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স বা চিকিৎসকের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে)।

খাবারের ক্ষেত্রে চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। ফলমূল বেশি খেতে হবে। ভিটামিন এ এবং সি জাতীয় ফলমূল বেশি খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। যে সব খাবারে বিটাক্যারোটিন রয়েছে, যেমন- গাজর, মিস্টি আলু এবং সবুজ শাকসবজি প্রচুর খেতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। যাদের ওজন বেশি অবশ্যই তাদের ওজন কমাতে হবে। মানসিক চাপ থাকলে সাইকোথেরাপিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। ধর্মীয় অনুশীলন মেনে চলতে হবে। জীবন যাত্রায় নৈতিকতা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।

প্রয়োজন মানসিক প্রশান্তি 
প্রাথমিক স্তরে ক্যান্সার নির্ণয় হলে তা আরোগ্য যোগ্য। এ জন্য ক্যান্সার নির্ণয় স্তরবিন্যাস (Staging) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্তরবিন্যাস নির্ভর করে প্রাথমিক স্থান থেকে তার আশপাশের এলাকা এবং দূরবর্তী এলাকার ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তার উপর। যেমন- ব্রেস্ট ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়তে পারে ফুসফুস, লিভার ও হাড়ে। এমনিভাবে ঝুঁঁকিপূর্ণ লক্ষণ চিহ্নিতকরণ, প্রাথমিক স্তরে রোগ নির্ণয় এবং স্তরবিন্যাস রোগীর চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যায়ের রোগীদের জন্য উপশমগত (Palliative care) চিকিৎসা দেয়াই চিকিৎসকের লক্ষ্য থাকে।

ক্যান্সার ধরা পড়লে রোগী হতাশায় নিমজ্জিত হয়। রোগীর আত্মীয়স্বজনকে চিকিৎসক সরাসরি ক্যান্সার নির্ণয়ের কথা জানালেও অনেক সময় রোগীকে তা জানতে দেয়া হয় না। তবে রোগী ভাবতে থাকে তার কোনো কঠিন রোগ হয়েছে। মনের অজান্তে সে নিজেকে ক্যান্সার রোগী হিসেবেই মনে করে। এ জন্য সে কাছের লোকদের বারবার জিজ্ঞেস করে, ডাক্তার তার রোগ সম্পর্কে কী বলেছে। শিক্ষিত এবং সচেতন রোগীরা সহজেই ডাক্তারের চিকিৎসা কৌশল বুঝে ফেলেন যে, তার ক্যান্সার হয়েছে। রোগীর স্বজনরা অনেক সময় চিকিৎসককেই আগেভাগেই বলে রাখেন, রোগী যাতে তার রোগের কথা না জানেন। এটা এক ধরনের মানসিক ব্যবস্থাপনা হলেও আধুনিক চিকিৎসা কৌশল হিসেবে রোগীকে রোগ সম্পর্কে জানিয়ে দেয়াই ভালো। রোগী তার রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলে চিকিৎসককে সে ভালোভাবে সহযোগিতা করতে পারে। রোগ সম্পর্কে তার একটি মানসিক প্রস্তুতিও গড়ে উঠে। বলা যায়, রোগীর মনে ইতিবাচক ভাবনার সৃষ্টি হয়।

ক্যান্সার চিকিৎসার মাল্টিমডেল পদ্ধতিতে গ্রুপে একজন মানসিক চিকিৎসক থাকা জরুরি। টিউমার বোর্ডের সভায় মানসিক চিকিসকের পরামর্শ গ্রহণকে এখন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। কারণ, ক্যান্সার নির্ণয় মানে রোগীর হাতে মৃত্যুর পরোয়ানা। তাই ক্যান্সার রোগীর মনে অতি সহজেই হতাশার জন্ম হয়।

হতাশা, বিষণ্নতা, মনমরা ভাব রোগীর রোগকে আরো বাড়িয়ে দেয়। রোগীর বিষণ্নতার (Depression) লক্ষণে পাওয়া যায় ওজন কমতে থাকে। কোনো কাজে শক্তি পায় না। কোনো কাজেই আনন্দ উৎসাহ থাকে না। সবসময় মৃত্যুচিন্তা তাকে ঘিরে রাখে। কখনো কখনো আত্মহত্যার ভাবনা জাগে। এ ছাড়া ক্যান্সার রোগীর অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তাও থাকে। ব্যয়বহুল ক্যান্সার চিকিৎসায় অনেক রোগীরই অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়। ফলে চিকিৎসা খরচ বহন করতে গিয়েও রোগীর মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। ক্যান্সার রোগীর হতাশা, বিষণ্নতা কাটাতে সাইকোথেরাপির প্রয়োজন হয়। এ জন্য ক্যান্সার রোগীর জন্য মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ জরুরি বিষয়। ক্যান্সার রোগীর মানসিক প্রশান্তি, চিকিৎসা সুবিধা, ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত রাখার জন্য হসপিস (Hospice care) কেয়ার সেন্টার অথবা সোশ্যাল সাপোর্ট গ্রুপ (social support group)-এর প্রয়োজন। উন্নত দেশে ক্যান্সার হাসপাতালগুলোর সাথে এ ধরনের সাপোর্ট গ্রুপ কাজ করে থাকে। এ ধরনের গ্রুপগুলো ক্যান্সার রোগীদের কাউন্সিলিং প্রোগ্রাম দিয়ে থাকেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here