মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান

0
25

 

মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাস

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্য, আধা সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং আপামর জনগণ যে যেখানে পেরেছে সেখান থেকে বিদ্রোহ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উচ্চ মনোবল ও তীব্র দেশপ্রেমের শক্তিতে বলীয়ান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক প্রতিরোধের এক পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার সীমান্ত সংলগ্ন তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ডাকবাংলোয় বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী এবং প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাহিনীগুলোর কর্মকান্ডের সমন্বয় সাধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সভায় সেদিন থেকেই বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাহিনীগুলোকে ‘মুক্তিবাহিনী’ নামে অভিহিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার কর্তৃক ১২ এপ্রিল তারিখে কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী পিএসসিকে বাংলাদেশ ফোর্সেসের কমান্ডার-ইন-চীফ (কেবিনেট মিনিস্টার মর্যাদাসহ) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ১২-১৫ জুলাই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তর কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডারদের কনফারেন্সে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে বাংলাদেশ ফোর্সেস সদর দপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামোর অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ফোর্সেসের অধীনে এই ১১টি সেক্টরের মাধ্যমে ৪ ডিসেম্বরে যৌথবাহিনী গঠনের পূর্ব পর্যন্ত ব্যাপকভাবে সমগ্র বাংলাদেশে কার্যকরভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। এছাড়াও সভায় লে. কর্নেল (অব.) এম এ রবকে বাংলাদেশ ফোর্সেসের চীফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে ডেপুটি চীফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্তি দেওয়া হয়। কর্নেল ওসমানী মুক্তিবাহিনীর সকল বিচ্ছিন্ন সংগঠনকে কেন্দ্রীয় কমান্ডের আওতায় নিয়ে আসেন এবং ফোর্সেস সদর দপ্তর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযযুদ্ধ কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে অপারেশনাল নির্দেশনার প্রণয়ন করেন। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর বিদ্রোহী বাঙালি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্য এবং তৎকালীন ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও নির্বাচিত সারারণ জনতার সমন্বয়ে গঠিত হয় নিয়মিত বাহিনী বা ‘মুক্তিবাহিনী’। অপরদিকে সাধারণ ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, সেচ্ছাসেবী এবং আপামর জনসাধরণকে নিয়ে গেরিলা পদ্ধতির আদলে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠন করা হয় ‘গণবাহিনী’। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সকল বাহিনীকেই তাঁদের সদস্যদের ও প্রচলিত অর্থে মুক্তিবাহিনী এবং ক্ষেত্র বিশেষে ‘মুক্তিফৌজ’ নামে অভিহিত করা হতো। ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী, গণবাহিনী এবং নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণ একযোগে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণের সূচনা করে যে কারণে প্রতি বছর ২১ নভেম্বর দিনটি সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে পালিত হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ফোর্সেসের অধীনে গঠিত বিভিন্ন ব্রিগেড এবং সেক্টরের নিয়মিত, অনিয়মিত সৈন্য এবং আঞ্চলিক গেরিলাদের সমন্বিত যুদ্ধ এবং ৪ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঠিত যৌথকমান্ডের চূড়ান্ত অভিযানের মধ্যে দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here