মিস বাংলাদেশ কি বাঙালী সংস্কৃতি বিরোধী?

0
39

মিস – ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা নারীর অপমান?

একটা ঘটনা বলে শুরু করি।আমাদের বাসায় একজন মুরুব্বী মারা গেছেন।তো চারদিন পর হুজুর কে দাওয়াত জানিয়েছি মিলাদের জন্য।হুজুর বলে দিয়েছেন,মিলাদের ঘরে যেন কোন ছবি না থাকে।খুবই সহজ কাজ।ছবিযুক্ত পোস্টার গুলো উল্টিয়ে রাখলেই হয়।কিন্তু না,প্র‍্যাকটিকালি যখন কাজটা ধরলাম,তখন বুঝলাম এটা কত কঠিন।

মিস বাংলাদেশ
বিছানায় কার্টুন আঁকা,দিলাম পাল্টায়া,বালিশের কভারে কার্টুন, ওইটাও পাল্টাই,টেবিল ক্লথে কার্টুন, বাজার থেকে নতুন ক্লথ আনলাম।গরম প্লেট রাখার প্লাস্টিক বা ম্যাটেও কার্টুন,প্লেটের নিচে মোটা খাতা বা বই দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হয়।ওমা,বই বা খাতার কভার,বেশিরভাগই ছবিযুক্ত।
শোকেসের ভেতর ছবি,শোপিস,সব কিছুই ছবি আর ছবি।ওয়ারড্রোব এ বাচ্চারা স্টিকার লাগিয়েছে,ওইটার উপর কাপড় পেঁচিয়ে দিলাম।

দেওয়াল ঘড়ি মিকিমাউসের আদলে,ওইটাও সরালাম।অবশেষে গোটা ঘরই উলটো করে ফেলতে হল।আমাদের শোচনীয় অবস্থা দেখে হুজুর রেহাই দিলেন।তিনি মিলাদ পড়তে রাজি হলেন।যদিও ঘরে তখন অনেক ছবিযুক্ত জিনিষ ছিল।

এবার আসি বাংলা সংস্কৃতিতে।
বাংলা সংস্কৃতিতে কি ঢাকা শহরের পিচঢালা রাস্তার কোন অস্তিত্ব আছে?বাংলা সংস্কৃতিতে মেঠো পথের অস্তিত আছে,পিচঢালা রাস্তা ইয়োরোপের শিল্প বিপ্লবের থেকেই এসেছে।বাংলা সংস্কৃতিতে কি টয়োটা গাড়ির অস্তিত্ব আছে?ঘোড়ার গাড়িই বাংলা সংস্কৃতির অংশ,অথবা পালকি।কিন্তু ভূলেও মোটর চালিত আধুনিক উচ্চগতির যানবাহন বাংলা সংস্কৃতির অংশ নয়।শিল্পবিপ্লব ই মোটর গাড়ির জন্মদাতা।

বহুতল ভবনসমূহ তো কোন ভাবেই বাংলা সংস্কৃতির অংশ নয়।এটা আমেরিকার শিকাগো ম্যানহাটন এর সংস্কৃতি।কুঁড়েঘর বা টিনের ঘর বাঙলা সংস্কৃতির অংশ।আরে,আমাদের জীবনযাপনের ৯৫/৯৬% ই বাংলা সংস্কৃতির বিপরীত, একেবারে সোজা কথা।এখন পুরোপুরি বাঙলা সংস্কৃতি মানলে,মিলাদের সময় আমাদের ঘর যেভাবে উলটে গিয়েছিল,সেভাবেই ঘরের মত পুরো দেশ উলটে যাবে।

Miss bangladesh
তাই,বাংলা সংস্কৃতি পুরোপুরিভাবে পালন করা সম্ভব নয়,পশ্চিমা সংস্কৃতি আসবেই।
কিন্তু সুন্দরী প্রতিযোগিতা যে সম্পূর্ণ ভাবে বাংলা সংস্কৃতি বা উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির সমর্থক,তা কখনো ভেবেছেন?
ধরেন,আমাকে বিয়ে দিবে বাবা মা,পাত্রী খুঁজছে।একজন পাত্রী পেল কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু অফিস যাওয়া আসা করে বলে সে আর তেমন ফর্সা নয়।তবুও ফর্সা।যোগ্যতাসম্পন্ন, কথা বলতে পারে সবার সাথে,ন্যাকামো কম করে।

আরেকটা মেয়ে,চাকরী করে না,ফর্সা,এবং একটু বেশি মেয়েলী, কমনীয়া, সুকোমল,আরো আরো আরকি।
আমার মা নিশ্চয়ই দ্বিতীয় মেয়েকেই পছন্দ করবে।আমিও নিশ্চয়ই ওই মেধাবী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বাদ দিয়ে সুকোমল,কমনীয়া মেয়েকেই রাক্ষসের মত তখনই পছন্দ করে ফেলব( o.0 )
ঠিক একই ভাবে,আমাদের সমাজের পুরুষরা মেধাবী মেয়ের চেয়ে কমনীয়া মেয়েদেরই বেশি লাইক করে।আমাদের না,এই উপমহাদেশীয় পুরুষেরাই।

পশ্চিমে মেধাবী, যোগ্যতা সম্পন্ন,সাহসী মেয়েদের অনেক পুরুষ পছন্দ করে,আমাদের উপমহাদেশে খুব কম।
ঠিক এই কাজ টাই করছে মিস ইউনিভার্স, মিস ওয়ার্ল্ড, মিস বাংলাদেশ।সুকোমল,কমনীয়া, লাস্যময়ী, ক্ষীণাঙ্গী,আবেদনময়ী দের তুলে আনছে মিস বাংলাদেশ।এটাতো সম্পূর্ণ ভাবেই আমাদের পুরুষদের আকাঙ্ক্ষিত মেয়েরা কেমন,তা দেখাচ্ছে,মেয়েরাও তেমনিভাবে নিজেদের তৈরি করছে,পুরোপুরি আমরা যা চাই।

আমাদের দেশের কয়জন পুরুষ চায় মেয়েরা শিক্ষিত, চাকুরীজীবী, যোগ্যতাসম্পন্ন হোক?
কিন্তু,লাস্যময়ী, আবেদনময়ী ঠিকই চায়।আমাদের সমাজ তো আবহমান কাল থেকেই নারীদের পড়ালেখা, চাকুরীবাকরি, মেধারপ্রদর্শন পছন্দ করে না।কোমল,কমনীয়া, লাস্যময়ী এগুলোই চায়।

ঠিক সেটাই করছে মিস বাংলাদেশ।
কিন্তু এর পরও কেন বিরোধিতা?

কারণটা হচ্ছে নারী । এই উপমহাদেশীয় পুরুষদের নারীর কোন কিছুই পছন্দ হচ্ছে না।তাই,তাদের মনমত কাজ করলেও সমালোচনা,মেধাবী হলেও সমালোচনা।

একজন মেধাবী, যোগ্যতাসম্পন্ন, প্রখরবুদ্ধিমতী নারী কোন ভাবেই বাঙলা সংস্কৃতি ধারণ করে না।বাঙলা সংস্কৃতিতে মেয়েরা অসূর্যস্পশ্যা, যাকে সূর্য কখনও দেখেনি,যার গায়ে সূর্যের আলো লাগেনি।বাঙলা সংস্কৃতিতে নারী হবে মোহিনী, ক্ষীণাঙ্গী,সুকোমলা,সুনয়না,দীঘলকেশী,লতার ন্যায়,লাস্যময়ী, খুব নময়ীয়া,ঢেউ খেলানো চুল এসবই।আর ঠিক সেগুলোর রুপায়ন করছে মিস বাংলাদেশ, মিস ওয়ার্ল্ড।পশ্চিমের বেশিরভাগ পুরুষ শিক্ষিতা, যোগ্যতাসম্পন্ন, চাকুরীজীবী আধুনিক মনা ওয়ান্ডার ওমেন পছন্দ করে,তারা বন্ধুদের কাছে নিজের বউয়ের শিক্ষা আর চাকরি নিয়ে গর্ব করে।সে হিসেবে মিস ওয়ার্ল্ড, আধুনিক কালের পশ্চিমা সংস্কৃতিরই বিরোধী।

লেখাটি সংগৃহীত…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here