বিশ্বের যেসব দেশে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ‘নিষিদ্ধ’

0
32

Bangladeshi passport

নিজ দেশ ছেড়ে কাজে অথবা বেড়াতে বিদেশে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশিদের । এমনি ঘটনা উঠে এসেছে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে।

২৪ জানুয়ারি, সকাল ৬টা। কম্বোডিয়ার নমপেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একশ যাত্রী নিয়ে অবতরণ করে ব্যাংকক এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট। যাত্রীরা বিমানবন্দরে নেমেই কম্বোডিয়ার অন-অ্যারাইভাল ভিসার জন্য আবেদন করেন। ইউরোপীয়, আমেরিকান, মঙ্গোলীয়, ভারতীয়দের পাশাপাশি ছয় বাংলাদেশিও ছিলেন এই ফ্লাইটে। সবাই এক লাইনে দাঁড়িয়ে পাসপোর্টসহ অন্যান্য কাগজপত্র জমা দেন। কিন্তু বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখার সঙ্গে সঙ্গে ছয় বাংলাদেশিকে লাইন থেকে আলাদা করা হয়। শুরু হয় কম্বোডিয়ার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ধমক মিশ্রিত বাক্যবাণ। এভাবে কেটে যায় প্রায় চার ঘণ্টা। এ সময়ে আটটি ফ্লাইটের কমপক্ষে ৫০০ যাত্রীকে একে একে সেখানে এসে আবেদন করে ভিসা-ইমিগ্রেশন শেষে বিমানবন্দর ত্যাগ করতে দেখা গেল। ছিলেন বেশ কিছু ভারতীয়ও। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই আন্তরিক ব্যবহার করে তিন-চার মিনিটেই সব কাজ শেষ করে দিচ্ছিলেন বিমাবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা। কিন্তু কম্বোডিয়া সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষেই এই বাংলাদেশিরা সেদেশে একটি কনফারেন্সে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। এ কথা বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের বলা হলেও রূঢ়ভাবে একপাশে বসে থাকতে বলা হয় ছয় বাংলাদেশিকে। চার ঘণ্টা পর বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর ভিসা দেন বাংলাদেশিদের।

তারপরও একদফায় ইমিগ্রেশন থেকে ফিরিয়ে দিয়ে পরে পাওয়া যায় ক্লিয়ারেন্স। টেলিফোনে বাংলাদেশের এক কূটনীতিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কম্বোডিয়ানরা এমনই করে, দুই দিন আগে বাংলাদেশি এক সিআইপি ও সরকারি পদস্থ কর্মকর্তাকেও কয়েক ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল। ’

নমপেন বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা ও অন্য যাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ট্যুরিস্টের গন্তব্যগুলোর মধ্যে একটি কম্বোডিয়া। প্রতিবছর কয়েক লাখ পর্যটক কম্বোডিয়ার কয়েক হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য দেখতে ভিড় করছেন সেখানে। পর্যটনই দেশটির প্রধান আয়ের উৎস। তাই বিশ্বের সব দেশের জন্যই অন-অ্যারাইভাল ভিসা ব্যবস্থা চালু রেখেছে কম্বোডিয়া। তাহলে বাংলাদেশি এই ছয় ব্যবসায়ী-সাংবাদিকের সঙ্গে এমন আচরণ কেন?

বিমানবন্দরে উপস্থিত এক কম্বোডিয়ান ব্যবসায়ী জানালেন, ‘বিশ্বের মাত্র ছয়টি রাষ্ট্রকে এদেশে একধরনের ‘নিষিদ্ধ’ রাখা হয়েছে। কম্বোডিয়া চায় না এই ছয় দেশের লোকেরা এখানে আসুক। বাংলাদেশ রয়েছে এই তালিকায়।

রাজধানী নমপেনে ব্যবসা করা কম্বোডিয়ান পাসপোর্টধারী বাংলাদেশি হুমায়ূন কবির বলেন, ‘আগে পাকিস্তানসহ এই নিষিদ্ধের তালিকা ছিল সাত দেশের। কিন্তু পাকিস্তান কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা করে কয়েক বছর আগে তালিকা থেকে নাম কাটিয়ে নিয়েছে। এখন পাকিস্তানিরাও কম্বোডিয়ায় অবাধে যাতায়াত করতে পারছেন। কিন্তু বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে নানান প্রতিবন্ধকতা রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশি কেউ নমপেন যেতে চাইলে তাকে সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংস্থার আমন্ত্রণপত্র, একজন কম্বোডিয়ান গ্যারান্টার, গ্যারান্টারের ব্যাংক ব্যালেন্স ও ট্যুরিস্টের ফেরার টিকিটসহ নানান কিছু নিশ্চিত করতে হবে। তারপর পাওয়া যেতে পারে তিন-পাঁচ দিনের ভিসা। কিন্তু ভারত, নেপাল, ভুটানিদের ক্ষেত্রেও কিছুই লাগে না। তারা আবেদন করলেই পেয়ে যায় ৩০ দিনের ট্যুরিস্ট ভিসা। ’

তিনি বলেন, ‘কম্বোডিয়ায় দূতাবাস স্থাপন করে কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ বাড়ানো ছাড়া বাংলাদেশের পাসপোর্টকে এ ধরনের অপমান থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়’।

অবশ্য বাংলাদেশি পাসপোর্টের এ সংকট শুধু কম্বোডিয়ায় নয়, বাংলাদেশিদের প্রায়শই একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয় এশিয়ার আরেক জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট গন্তব্যের স্থান ইন্দোনেশিয়াতে।

ঢাকার একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সামিয়া জামান জানান, ‘গত ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালি এয়ারপোর্টে শুধু বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছে আমাকে। আমার চোখের সামনে দিয়ে অন্য সবাই ইমিগ্রেশন পেরিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমাকে বসিয়ে রাখা হয়। এমনকি বাথরুম ব্যবহার থেকেও বিরত রাখা হয়। অপমানে ও লজ্জায় আমার চোখে পানি আসে। পরে আমার স্বামী বিকালের ফ্লাইটেই মালয়েশিয়ায় চলে আসার ব্যবস্থা করেন। ’

জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বাংলাদেশিদের ভিসা সংকট ও ভোগান্তি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বাংলাদেশকে বরাবরই সম্মানের চোখে দেখা ভুটানও এখন প্রায়শই অন-অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্যারান্টার চাইছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার মতো দেশ কিছু দিন আগে বন্ধই করে দিয়েছিল বাংলাদেশিদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা। পরে বাংলাদেশও বন্ধ করে দিলে চাপের মুখে শ্রীলঙ্কা আগের অবস্থান থেকে সড়ে আসে।

ভুটান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর পরিস্থিতি আলাদা হলেও বিশ্বের উন্নত দেশগুলো দিন দিন বাংলাদেশিদের ভিসা কঠোর থেকে কঠোর করছে। ৭০ থেকে ৮০ ভাগ পর্যন্ত ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করছে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো। ব্রিটেন ও কানাডার মতো দেশগুলোর ভিসা সেন্টারই নেই বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও ঢাকা ও সিলেটের ব্রিটিশ ভিসা সেন্টার বন্ধ করে নয়াদিল্লি নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার। অনেক ক্ষেত্রে ভিসা হাতে পেতে পেতে শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো সহজলভ্য ভিসার দেশগুলোতেও এখন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হয়েছে। জটিলতায় পড়তে হচ্ছে সিঙ্গাপুরের ভিসার ক্ষেত্রেও। আগে চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়সূচির প্রমাণপত্র দিলে সহজে ভিসা দেওয়া হতো। এখন চিকিৎসার জন্য ভিসার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের হারও আগের তুলনায় হয়েছে দ্বিগুণ।

মালয়েশিয়ায় সিঙ্গেল এন্ট্রি ট্যুরিস্ট ভিসা এয়ারলাইন্সের রিটার্ন টিকিট এবং কোথায় কত দিন থাকবে তার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হলেও মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মতে, সবচেয়ে বেশি ভিসা ভোগান্তিতে পড়েছেন বাংলাদেশি শ্রমিক ও বিদেশ গমনেচ্ছুরা। ভিসা বন্ধ থাকায় আরব আমিরাতে নতুন কোনো শ্রমিক তো যেতেই পারছেন না, অনেক ক্ষেত্রে মানবেতর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে আমিরাত প্রবাসী প্রায় আট লাখ বাংলাদেশিকে।

২০১২ সাল থেকে শুধু বাংলাদেশিদের জন্য আমিরাতে ভিসা বন্ধ রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানি, ভারতীয়, নেপালিরা অবাধে ওয়ার্ক ভিসায় সেখানে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আর বাংলাদেশিরা নিজেদেরে আকামা বা চাকরির ছাড়পত্র পরিবর্তনের সুযোগ আছে এখনো না পাওয়ায় বছরের পর বছর একই বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোতেও বাংলাদেশিদের কাজের ভিসা প্রায় বন্ধ। কূটনীতিক ও অফিশিয়াল ছাড়া বাংলাদেশিদের অন্য সব ভিসার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কুয়েত ও কাতার। সৌদি আরবেও নারী শ্রমিক পাঠানোর একটি শর্তে মাঝে মাঝে পুরুষ শ্রমিকদের ভিসা বন্ধ থাকছে। বার বার আশার কথা শোনালেও মালয়েশিয়ায় ওয়ার্ক ভিসা বন্ধ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ, যে দেশটি এতদিন বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মুখিয়ে থাকত তারাও এখন বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশিদের ‘ওয়ার্ক ভিসা’।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি দেশে বাংলাদেশিদের নিজেদের মধ্যে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, একাধিক দেশের জঙ্গি তত্পরতার অভিযোগে বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতারের পাশাপাশি ঢাকার গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে হামলার ঘটনার কিছু নেতিবাচক প্রভাব ভিসার ক্ষেত্রেও পড়েছে।

তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক আলোচনা ও অবস্থানের কারণে এই সমস্যা তীব্র হয়নি বলে দাবি করেন পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তারা।

আর পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ভিসা নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে যে ধরনের সংকট আছে তা সমাধানে কূটনৈতিক চ্যানেলে চেষ্টা করা হচ্ছে। শিগগির সংকট কেটে যাওয়ার বিষয়ে আমরা আশাবাদী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here