বানভাসি মানুষের কান্নায় কি! আকাশ বিদীর্ণ হচ্ছে!

0
20

দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯০টি পানি সমতল স্টেশনের পর্যবেণ অনুযায়ী ৪৯টি পয়েন্টের পানি হ্রাস পেয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৭টি এবং ৪টি পয়েন্টের পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা, সুরমা ও কুশিয়ারাসহ দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি আরও কমেছে। তবে বন্যা কবলিত এলাকায় পানিবন্দি দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখন দুঃসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাদ্য নেই, পানি নেই, থাকার জায়গা নেই, নেই কোনো সহাল সম্বল। পানিবন্দি মানুষ জীবন বাঁচাতে আহাজারি করছে। দিনরাত মানুষ শুধু একটু ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছে। কোথাও কোনো ত্রাণের খবর পেলেই হাজার হাজার মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। সরকারি হিসেবে বন্যায় ৫ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দুর্গতদের সহায়তায় সে হিসেব নেই। এমপি, মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তারা ফটোসেশনের ত্রাণে ব্যস্ত। দুর্গত এলাকায় সংবাদদাতাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়, খাদ্যের জন্য দিনভর মানুষের আহাজারি আর অপেক্ষা। পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ অমানবিক জীবন যাপন করছে। সরকারি ত্রাণের তালিকাতে আছে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ। বেসরকারি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয় উদ্যোগে কিছু ত্রাণ তৎপরতা দেখা যায়। ত্রাণ নিয়ে গেলেই মানুষের ভিড় লেগে যায়। কিন্তু সবাইকে ত্রাণ দেয়াও যাচ্ছে না।

Ban vasi

ত্রাণ না পেয়ে বেশিরভাগ বুভুুক্ষ মানুষ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে। পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসব এলাকার লাখ লাখ মানুষ। আবহাওয়া দফতর থেকে জানায়, দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি হ্রাস পাচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও পানি বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯০টি পানি সমতল স্টেশনের পর্যবেণ অনুযায়ী ৪৯টি পয়েন্টের পানি হ্রাস পেয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৭টি এবং ৪টি পয়েন্টের পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় ৯০টি সমতল স্টেশনের পর্যবেণ অনুযায়ী ২৬টি পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদ-নদীর পরিস্থিতি সম্পর্কে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল এ কথা জানানো হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও পদ্মা নদীসমূহের পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে, অপরদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। গঙ্গা ও সুরমা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও পদ্মা নদীর পানি সমতল হ্রাস আগামী ৭২ ঘন্টায় অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘন্টায় পদ্মা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল থাকবে।

অপরদিকে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল আগামী ২৪ ঘন্টায় হ্রাস পেতে পারে। গতকাল সকাল ৯ পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় সিলেটে ৯৮ মি.মি. সুনামগঞ্জে ৯০ মি.মি. ঢাকায় ৭০ মি.মি. ভাগ্যকুলে ৬৫ মি.মি. নওগাঁয় ৬২ মি.মি. পটুয়াখালী ৬০ দশমিক ৩ মি.মি. ফরিদপুরে ৫৪ দশমিক ৫ মি.মি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। : দেশের অনেক পৌরসভা ও উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামই বন্যাক্রান্ত হয়েছে। পানি কমছে কিন্তু বসতবাড়ি ফিরে পাচ্ছেন না অনেকে। নদীতীরবর্তী গ্রামগুলো জনশূন্য খাঁ খাঁ করছে। কোনো কোনো গ্রামের অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে প্রায়। বন্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যমুনা। বন্যার পর অবশিষ্ট থাকা এলাকাগুলোও গ্রাস করছে। নওগাঁর মান্দা উপজেলার দারিয়াপুর গ্রাম। পাশের গ্রাম থেকে গলা পানি মাড়িয়ে এসেছেন ৫৫ বছরের বৃদ্ধা আরতি রানী। লোকমুখে তিনি শুনেছিলেন ত্রাণ বিতরণের কথা। কিন্তু এখানে এসে তার কপালে জোটেনি কোনো সাহায্য। খালি হাতে ফেরার সময় কাউকে পেলেই ত্রাণের জন্য হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। আত্রাই নদীর বানে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তার ধারে। পরিবারের আয় উপার্জনের কেউ নেই। ঘরে খাবারের জোগাড়ও নেই। যা ছিল কয়েক দিনে তাও শেষ। তাই দুদিন ধরে পেটে ভাত যায়নি। কোনো বেলা পাউরুটি আবার কোনো বেলা চিড়া খেয়ে আছি। একদিন আগেই স্থানীয় এমপি ও পাটমন্ত্রী ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক ত্রাণ বিতরণ করে গেছেন। তবে বেশির ভাগ মানুষই ওই সাহায্য পাননি। এ নিয়ে হট্টগোল হয়েছে। কিন্তু লাভ হয়নি। এই জেলার বানভাসি মানুষ এখন খাবার ও চিকিৎসার অভাবে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে শত শত বানভাসি আশ্রয় নিলেও বিপদ তাদের পিছু ছাড়েনি। প্রসাদপুর ইউনিয়নের দারিয়াপুর গ্রামের সড়কের দুই পাশে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েকশ বানভাসি পরিবার। ওই এলাকার হাফিজউদ্দিন মৃধা জানান, এক সপ্তাহ ধরে বন্যায় মানুষ দিশেহারা। থাকার জায়গা নেই। খাবার নেই। এ অবস্থায় বেঁচে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু সবাই শুধু মুখে মুখে সাহায্যের কথা বলছে। বাস্তবে কোনো কিছুই নেই। আর রাস্তায় ঠাঁই নেয়াদের আপাতত থাকার ছাউনির জন্য প্লাস্টিক দিয়েছে একটি এনজিও।

কিন্তু এর বাইরে কিছু পাইনি। মন্ত্রী ত্রাণ বিতরণ করলেও পেয়েছেন দলীয় সমর্থকরা। প্রকৃত নিঃস্বরা পায়নি। উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের রেবা আখতার দাখিল মাদ্রাসা বন্ধ করে বানভাসি কয়েকশ নারী-পুরুষকে রাখা হয়েছে। এখানে ঠাঁই নেয়া কয়েকজন জানান, তিন দিন ধরে তারা ভাত খেতে পাননি। সকালে পাউরুটি দেয়া হয়। দুপুরে খিচুড়ি। রাতে চিড়া। এসব খেয়ে তো আর দিন চলে না। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা তীব্র খাবার সংকটে পড়েছেন। ওই মাদ্রাসার শিক নজরুল ইসলাম বলেন, প্রায় আট শ মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। শোয়ার জায়গা নেই। খাবার পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থাও নাজুক। স্থানীয় যারা বিত্তবান আছেন, তারাই কেউ সকালে, কেউ দুপুরে আবার কেউ রাতের খাবারের খরচ দিচ্ছেন।

দিনাজপুরে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে সুফিয়া বেগম নামের একজন জানান, তার স্বামী মারা গেছেন প্রায় ২২ বছর আগে। তিনটি ছাগল আর একটি গরু নিয়ে লাইনে আশ্রয় নিয়েছেন। এরই মধ্যে গরুটি মারা গেছে। ছাগলগুলোও মরে মরে অবস্থা। আশ্রয় নেয়া রহিমা বেগম, মনোয়ারা বেগম, রহিলা বেগম, বেবী, রোকসানা, রুমা, জিরন মিয়া, পলাশ, জাহাঙ্গীর আলম, শিল্পী বেগমসহ প্রায় অর্ধশত লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের নিদারুণ দুর্ভোগের কথা। তারা জানান, জনপ্রতিনিধি কিংবা সমাজসেবক কেউই একটিবারের জন্য তাদের দেখতে আসেননি। আশ্রয় কেন্দ্রের সাথে রেল লাইনের ওপর রান্না করছিলেন ফেন্সি আক্তার নামের এক নারী। পাশে তিন শিশু সন্তান কান্না করছিল। ফেন্সি জানান, গত তিনদিনে মধ্যে কেউ ত্রাণ নিয়ে আসেননি। তিনি জানান, স্বামী ফরিদুল ইসলাম ফেরি করে বাদাম বিক্রি করেন। বন্যার কারণে বাদাম বিক্রিও বন্ধ। ৭৯ বছর বয়সী নারী আমেনা বেগম জানান, এখানে যারা আশ্রয় নিয়েছেন তারা সবাই গরিব। এই মানুষগুলোকে কেউ দেখতে আসেননি। এদিকে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলোকে লাইন ছেড়ে যেতে বলেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here