দেশে ডলারের দামে অস্থিতিশীল। বেড়েই যাচ্ছে ডলারের দাম

0
25

dollar

কয়েক মাস ধরেই অস্থিরতা চলছে দেশের ডলারের বাজারে। রফতানি ও রেমিট্যান্স থেকে আয় কমে যাওয়া এবং খাদ্যশস্যসহ অন্যান্য খাতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের বাজারে সংকট চলছে। গত সপ্তাহে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রতি ডলারের বিক্রয়মূল্য ৮৪ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে গতকাল তা ৮৩ টাকায় নেমে আসে। যদিও খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮৫ টাকায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা চলছে। শুধু চলতি অর্থবছরেই বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। নভেম্বরের ১২ দিনেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিক্রি করেছে প্রায় ১৫ কোটি ডলার। কোনোভাবেই আমদানি পর্যায়ে ডলারের দাম যাতে ৮৩ টাকার বেশি না হয়, সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) চেয়ারম্যান ও মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, সুশাসনের ঘাটতির কারণেই দেশে ডলারের বাজারে এ অস্থিতিশীলতা। এ মুহূর্তে বাজারে কোনো স্ট্যান্ডার্ড বা আইডিয়াল সিচুয়েশন নেই। সুযোগ পেলেই ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু ব্যাংক ডলারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যাংকগুলোর ডলার সংরক্ষণের হার কিছুটা কমিয়ে দিলে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দুই বছর ধরেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান মাধ্যম রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহে ভাটা চলছে। অন্যদিকে রেকর্ড পরিমাণ চালসহ খাদ্যশস্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হওয়ায় দেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের চলতি হিসাবে ১৭৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এ তিন মাসে ৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। তবে অর্থবছর শেষ হয় ১৪৮ কোটি ডলারের ঘাটতি নিয়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ১ হাজার ৯২০ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে; আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ২৪ শতাংশ এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে। অথচ এ সময়ে রফতানি বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আড়াই শতাংশ কমার পর গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স সাড়ে ১৪ শতাংশ কমেছে। গত অর্থবছর আমদানিতে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে রফতানি বাড়ে মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় ডলারের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।

ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। তবে একই সময়ে বাজার থেকে ১ ডলারও কেনার প্রয়োজন হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের। অথচ গত অর্থবছর বাজারে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রির বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাজারে ১ ডলারও বিক্রির দরকার হয়নি। যদিও ওই অর্থবছর বাজার থেকে ৪১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগের কয়েক অর্থবছরেও দাম পড়ে যাওয়া ঠেকাতে বাজার থেকে অতিরিক্ত ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনেছিল।

বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হওয়ায় গতকাল ডলারের দর আন্তঃব্যাংকেই ৮১ টাকা ৯০ পয়সায় উঠে যায়। গত বছর আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম ছিল ৭৮ টাকার কাছাকাছি। গতকাল বেসরকারি এনসিসি ব্যাংকে ডলারের ক্রয়মূল্য ছিল ৮১ টাকা ৯৫ পয়সা ও বিক্রয়মূল্য ৮২ টাকা ৯৫ পয়সা। সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ ব্যাংকেই এ মূল্যে ডলার বেচাকেনা হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকগুলো নগদ ডলার সাড়ে ৮৩ থেকে ৮৪ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তরিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, খাদ্যশস্যসহ সরকারি বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিল পরিশোধের জন্য আমরা হন্যে হয়ে ডলার খুঁজছি। বাংলাদেশ ব্যাংক আরো বেশি হারে বাজারে ডলার ছাড়লে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যেত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ইচ্ছামতো নিজেদের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখতে পারে না। এজন্য নির্ধারিত সীমা বেঁধে দেয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ব্যাংক দিন শেষে তার মোট মূলধনের ১৫ শতাংশ সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করতে পারে। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ডলার থাকলে দিন শেষে বাজারে বিক্রি করতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জরিমানা গুনতে হয়।

সর্বশেষ ১ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ৩ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার। বড় অংকের এ মজুদ সত্ত্বেও সম্প্রতি ডলারের বাজারে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা ভোগ্যপণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আমদানিকারকরা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিত্ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ডলারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে ভোগ্যপণ্যের বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়ে। ডলারের বাজার যাতে স্থিতিশীল থাকে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।

বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। ওই বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশী ব্যাংকগুলো যথাসময়ে বাজারে ডলার বিক্রি করছে না। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিদ্যমান অস্থিরতা সাময়িক। চাহিদা কমে গেলে বাজার এমনিতেই স্থিতিশীল হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here