চাল নিয়ে নতুন সংকট!দেশে কি দুর্ভিক্ষ হবে?

0
16

অতিবৃষ্টি, বন্যা, সংকট, সরবরাহে ঘাটতি, মজুদ কমে যাওয়া ও মিলারদের কারসাজিতে দেশের সর্বত্র সব ধরণের চালের সংকট তৈরি হলে ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। একই সঙ্গে সরকারও বিভিন্ন দেশ থেকে ‘জি-টু-জি’ পদ্ধতিতে চাল আমদানি উদ্যোগ নেয়। শুধু তাই নয় সংকট কাটাতে চালের আমদানি শুল্কও কমানো হয়। কিন্তু এতকিছুর পরও দেশের বাজারে কমেনি চালের দাম। এখন মিয়ানমার থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে চলে আসার পর থেকে শুরু হয়েছে চালের নতুন সংকট।

Rice-Bangladesh

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত ২৫ আগস্ট থেকে দেশে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আসায় আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে চালের বাজার। গত ১০দিনে চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৬ থেকে ৮ টাকা। মোটা চালের কেজি ৫০ থেকে ৫২ টাকা ছুয়েছে। আর চিকন চালের দাম গিয়ে ঠেকেছে ৬২ থেকে ৬৬ টাকায়। যদিও বন্যার শুরুতে বাজারে চাল দাম কেজিতে বেড়েছিলো ১০ টাকা। তখন চালের সংকট মেটাতে চালের আমদানি শুল্ক কমানো এবং চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তাতে পাইকারি বাজারে চালের দাম কেজিতে কমে মাত্র ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা। এরই মধ্যে চালের দাম ফের বেড়েছে। এখন দেশের সর্বত্রই মোটা চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা দরে।

হঠাৎ করে চালের এই অস্বাভাবিক অস্থিরতার কারণ বিশ্লেষণে জানা যায়, বর্তমানে সরকারের সব মহল এখন রোহিঙ্গা নিয়ে ব্যস্ত। বাজারের দিকে কারও কোনও খেয়াল নাই। সুযোগ বুঝে কোনও কারণ ছাড়াই অসৎ ব্যবসায়ীরা বাড়িয়ে দিয়েছে চালের দাম। যে যেভাবে পারছে সেভাবেই মুনাফা লুটে নিচ্ছে।

জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়ৎদাররা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সে কারণেই খুচরা বাজারে চালের দাম বেড়েছে। আবার আড়ৎদাররা দাম বৃদ্ধির জন্য মিলারদের দায়ী করছেন। তারা বলছেন, ‘মিলাররা চাল ছাড়ছে না, এ কারণে নতুন করে চালের দাম বেড়েছে।’

আবার কোনও কোনও ব্যবসায়ী অতিবৃষ্টিকে দায়ী করে বলছেন, ‘অতিবৃষ্টিতে রাস্তা-ঘাট ডুবে গেছে। চাল পরিবহনে ট্রাক পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও ২০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।’ কেউ আবার বলছেন, ‘বৃষ্টিতে মজুদ করা চাল নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বাজারে চালের সরবরাহ কমে গেছে।’

এদিকে ব্যবসায়ীদের নানা তাল-বাহানার মধ্যেও ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন করে ২০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির জন্য পৃথক পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সরকার। চুক্তির আওতায় ভিয়েতনাম থেকে আমদানিকৃত চাল দেশে আসতে শুরু করেছে।

তবে মিয়ানমার থেকে বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির চুক্তি করতে গিয়েও খালি হাতে ফিরে এসেছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। মিয়ানমার চাল রফতানির সিদ্ধান্তটি স্থগিত রেখেছে। এটিও চালের বাজারে নতুন সংকট সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে, বেসরকারি উদ্যোক্তারা ভারত থেকে প্রতিদিন চাল আমদানি করছে। যা বেনাপোল, হিলি ও সোনা মসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে চাল আসছে। কিন্তু আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে চাল রফতানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। এ বিষয়ে ভারতীয় কাস্টমস একটি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশকে। ভারতের এ সিদ্ধান্ত চালের বাজারের নতুন সংকটকে তীব্রতর করবে, বলেও মনে করছেন ভোক্তা-ব্যবসায়ী উভয়েই।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘৩০ টাকা কেজি দরে কোনদিনই আর চাল খাওয়ানো সম্ভব হবে না। বাজারে চালের কোনও সংকট নেই। দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কাজেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। যেভাবে বলা হচ্ছে, বাজারে চালের দাম সেভাবে বাড়েনি।’ মোটা চাল বাজারে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, বলেও দাবি করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

Rice Bangladesh

ভারতের চাল রফতানি না করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নাই। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার এই মুহূর্তে দেশের বাইরে। ডেপুটি হাই কমিশনারও রয়েছেন উখিয়ায়। ওনারা ফিরলে ওনাদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

পাশাপাশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হচ্ছে চাল। এখানেও বাড়তি চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে। যা মোট মজুদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। যা চালের বাজার অস্থির করে তুলছে বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের আরাকান থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজার, টেকনাফ ও উখিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা। সেখানেও সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা দিতে হচ্ছে। চালের মজুদের ওপর এটিও প্রভাব বিস্তার করছে। এ প্রভাব সামনে আরও বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চালের মোকাম বলে খ্যাত কুষ্টিয়া, নওগাঁয় চালের দাম বেড়েছে অতিবৃষ্টি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘বন্যাই তো শেষ হয়নি। এর ওপর আবার সীমাহীন বৃষ্টি। এতে রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে গেছে, রাস্তাঘাট নষ্ট, ভাঙাচোড়া। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। আগে নওগাঁ থেকে এক ট্রাক চাল ঢাকায় আনতে ভাড়া লাগতো ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা, সেখানে এই সময়ে ভাড়া গুণতে হচ্ছে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। পরিবহনের এই বাড়তি ব্যয় চালের ওপর পড়ছে। ফলে দাম বাড়ছে।’

জানতে চাইলে উত্তরবঙ্গ ট্রাক চালক সমিতির নেতা আবু তালেব জানান, রাস্তাঘাট খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। ফলে একটি ট্রাক গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় বেশি লাগছে। আর ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালালে ট্রাকের ক্ষতি হয় বলে মালিকরাও গাড়ি দূরের রাস্তায় ছাড়তে চান না।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, গত এক বছরের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে ১২ শতাংশ। আর মাসিক মূল্যের ভিত্তিতে মোটা চালের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বছর ভিত্তিতে টিসিবি দেখিয়েছে এক বছর আগে এ চালের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৩২ থেকে ৩৪ টাকা। আর বাজারে বর্তমানে এ চালের দাম কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা দরে। গত দশ বছরে চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ২৫ থেকে ২৮ টাকা। মোটা চালের পাশাপাশি সরু ও মাঝারি দানার চালের দামও বেড়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তার এক বিশ্লেষণে বলেছে, গত এক দশকে পাঁচ ধরনের চালের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব ধরনের চালের দাম ১০ বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

কালের বার্তার বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদেও চালের বাজারের অস্থিরতার বিষয়টি জানা গেছে। সিলেটের মেসার্স মতিউর রহমান অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক বলেন, ‘মোটা ও চিকন চালের প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) এখন ৩০০-৩৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।’ সিলেটের আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ভারতে চালের দাম বৃদ্ধির কারণে সেখান থেকে এখন তেমন চাল আমদানি করা হচ্ছে না। এ কারণে বর্তমানে প্রতি কেজি চালে ৩ থেকে ৪ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া অভিযোগ করে তারা বলেন, ‘বর্তমানে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে চট্টগ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ী। তারা সিন্ডিকেট করে কয়েক লাখ টন চাল মজুদ করে রেখেছে। যাতে করে বাজারে চালের সংকট দেখা যায়।’

রংপুর প্রতিনিধি জানান, রংপুরে প্রায় সব ধরনের চালের দামই বেড়েছে। ভারতীয় চাল যেখানে কেজি প্রতি ছিল ৪৫ টাকা এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৪৯ টাকা দরে। জিআর-২৮ চাল আগে যেখানে কেজি প্রতি বিক্রি হতো ৫০ টাকায় এখন সে চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৩ টাকায়। এছাড়া মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৬ টাকায়।

রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) খুচরা চালের দাম স্বর্ণা প্রতি কেজি ৪৪-৪৬, আটাশ ৫২-৫৪, মিনিকেট ৫৬-৫৪, নাজির শাইল ৫৮, বাসমতি ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাজশাহী নগরীর কুমার পাড়া এলাকায় পাইকারী চাল ব্যবসায়ী ও কমিশন এজেন্ট আহম্মদ রাইস এজেন্সির ম্যানেজার আমানুর রশিদ বলেন দাম বাড়ার কারণ হিসাবে বলেন, ‘সরকার থেকে ট্যাক্স কমে যাওয়ার পর থেকে ভারত থেকে চাল আমদানি কমে গেছে। কোরবানির পর থেকে চাল আর আমদানি হয় না বললেই চলে।’

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ৪৮ টাকার নিচে এখন বাজারে কোনও চাল নেই। মোটা চাল ৪৮ টাকা কেজি। ঈদের আগে এই চাল ছিল ৪৪ টাকা। এছাড়া, মিনিকেট চালের দর বর্তমানে প্রতি কেজি ৬৩ টাকা, নাজিরশাল ৬৫, আটাশ ৫৫, কাটারিভোগ ৮০ ও বাসমতি চাল ৭০ টাকা। ঈদের আগে প্রত্যেক চালের দাম কেজি প্রতি ৫-৭ টাকা কম ছিল।

খুলনা প্রতিনিধি জানান, জেলায় চালের দাম কেজি প্রতি ১-২ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। চাল ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে আড়তে ওই বালাম চাল ৪৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এআর মিনিকেট চাল সাড়ে ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা, স্বর্ণা মোটা চাল ৩৯ টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ৪২ টাকা, স্বর্না মিনিকেট চাল ৫২ টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ৫৪ টাকা, বালাম-২৮ চাল ৪৬ টাকা থেকে বেড়ে ৪৯ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here